চীন কিভাবে বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের টানছে? বৈজ্ঞানিক মহাশক্তির লড়াইয়ে চীনের কৌশল


ভূমিকা:  বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব নেতৃত্ব দখলের লক্ষ্যে চীন আজ সক্রিয়ভাবে বিশ্বের তাবড় গবেষক, উদ্ভাবক ও বৈজ্ঞানিক প্রতিভাদের আকৃষ্ট করতে মরিয়া। বিশাল বিনিয়োগ, উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের জন্য বিশেষ নীতি নিয়ে দেশটি গত কয়েক দশক ধরে এক অভূতপূর্ব 'ব্রেইন গেইন' (Brain Gain) অভিযান চালাচ্ছে।চীনের প্রধান কৌশলসমূহ: 

১. অবিশ্বাস্য আর্থিক প্রণোদনা ও গবেষণা তহবিল: 

   *   বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিপুল পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ (সালে শত শত বিলিয়ন ডলার)।

   *   শীর্ষস্থানীয় বিদেশী বিজ্ঞানীদের আকর্ষণীয় বেতন, সাইন-অন বোনাস, আবাসন সুবিধা ও গবেষণা খাতে প্রায় সীমাহীন তহবিলের প্রস্তাব দেওয়া হয়। 

   *   'হাজার প্রতিভা প্রকল্প' (Thousand Talents Plan)-এর মতো ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রামের মাধ্যমে নির্বাচিত গবেষকদের জন্য বিশাল অনুদান। 

২. অত্যাধুনিক গবেষণা সুযোগ-সুবিধা: 

   *   শেনজেন, সাংহাই, বেইজিং-এ বিশ্বমানের গবেষণা ল্যাব, সিনক্রোট্রন, সুপারকম্পিউটার কেন্দ্র নির্মাণ। 

   *   কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, জিন এডিটিং, স্পেস টেকনোলজির মতো চোখধাঁধানো ক্ষেত্রে অগ্রগামী প্রকল্পে কাজ করার সুযোগ। 

৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন: 

   *   'বেল্ট অ্যান্ড রোড' উদ্যোগের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা জোরদার করা। 

   *   বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যৌথ গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন (যেমন: MIT, Stanford, Cambridge-এর সাথে চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারিত্ব)। 

   *   'C9 লীগ' বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়ন এবং নতুন করে 'ডাবল ফার্স্ট ক্লাস' বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা, যেগুলোর আন্তর্জাতিক র্যাংকিং দ্রুত বাড়ছে। 

৪. প্রতিভাবানদের জন্য সহজীকরণ: 

   *   ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করা (R ভিসা - Talent Visa), স্থায়ী বসবাসের (গ্রিন কার্ড) সুবিধা। 

   *   আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা, আন্তর্জাতিক স্কুলের সুবিধা প্রদান। 

   *   গবেষণার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন ও কম আমলাতান্ত্রিক বাধার প্রতিশ্রুতি (যদিও বাস্তবতা কিছুটা জটিল)। 

৫. দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ: 

   *   বিদেশে পড়াশোনা করা চীনা ছাত্র-গবেষকদের ('সি-ড্রাগন') দেশে ফিরে আসার জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও ক্যারিয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। 

প্রভাব ও সাফল্য: 

*   চীনের বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা ও গুণগত মান (সাইটেশন) দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। 

*   উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নতি (যেমন: Huawei, DJI, BYD)। 

*   নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির মতো মাইলফলক ছুঁতে শুরু করেছে। 

*   মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বৈজ্ঞানিক প্রতিভা আকর্ষণে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। 

চ্যালেঞ্জ: 

*   কিছু দেশের (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) সাথে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্তেজনা বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাকে প্রভাবিত করছে। 

*   বৌদ্ধিক সম্পত্তি চুরি ও প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে উদ্বেগ। 

*   চীনের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে অভ্যস্ত হওয়া কিছু বিদেশী গবেষকের জন্য চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। 

*   গবেষণার স্বাধীনতা নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা। 

উপসংহার:  বৈজ্ঞানিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন চীনের জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। দেশটি শুধু নিজস্ব প্রতিভাই লালন করছে না, বিশ্বের সেরাদেরকেও টানতে রোল আউট রেড কার্পেটের নীতি অবলম্বন করছে। যদিও কিছু বাধা-প্রতিবন্ধকতা আছে, তবুও অর্থ, সুযোগ-সুবিধা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই কৌশল ইতিমধ্যেই চীনকে বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে একটি অগ্রগামী শক্তিতে পরিণত করেছে। আগামী দিনে বৈশ্বিক উদ্ভাবনের মানচিত্রে চীনের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বিশ্বের সেরা মস্তিষ্কগুলোর জন্য চীনের এই 'প্রতিভা যুদ্ধ' (Talent War) নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক বিজ্ঞান নীতিকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।  


লেখক: ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (PSO), বিসিএসআইআর । ধন্যবাদ আমাদের ব্লগ পড়ার জন্য। নতুন পোস্টগুলোর জন্য চোখ রাখুন এবং আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এটি একটি দুর্দান্ত পোস্ট! বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতি আপনার গভীর আগ্রহ ও গবেষণার প্রতি প্রতিশ্রুতি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আমি আপনার ব্লগ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারছি এবং ভবিষ্যতে আরও নতুন বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য অপেক্ষা করছি। এই ধরনের পোস্টগুলো আমাদের গবেষণার দিশা ঠিক করতে সাহায্য করবে। সত্যিই, একসাথে জ্ঞান ও উদ্ভাবনকে সীমাহীন করে তোলা সম্ভব! ধন্যবাদ এমন চমৎকার একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার জন্য।

এই ব্লগটি সন্ধান করুন